সরকারি আজিজুল হক কলেজ ( Govt. Azizul Haque College)

সরকারি আজিজুল হক কলেজ
Govt. Azizul Haque College Logo

সরকারি আজিজুল হক কলেজ (Govt. Azizul Haque College)  বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের অন্যতম সুপ্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যা বগুড়া জেলার প্রানকেন্দ্র  কামারগারিতে অবস্থিত এবং দীর্ঘদিন ধরে মানসম্মত শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে। সরকারি আজিজুল হক কলেজ বাংলাদেশের একটি শীর্ষস্থানীয় ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।  এটি প্রায় ৫৫ একর জমির উপর অবস্থিত। ১৯৩৯ সালে একটি উচ্চ মাধ্যমিক কলেজ হিসেবে যাত্রা শুরু করা এই প্রতিষ্ঠানটি তৎকালীন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্যার আজিজুল হকের  নামানুসারে নামকরণ করা হয়, যা এর ঐতিহাসিক গুরুত্বকে আরও উজ্জ্বল এবং সমৃদ্ধ করেছে। বর্তমানে এটি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ( National University)-এর অধিভুক্ত একটি  গুরুত্বপূর্ণ স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যেখানে উচ্চ মাধ্যমিক থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন পর্যায়ে পাঠদান পরিচালিত হয়।এটি বাংলাদেশের উত্তর অঞ্চলের বৃহত্তম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।  উত্তরবঙ্গের শিক্ষার্থীদের কাছে ‘উত্তরবঙ্গের আলো’ ("The Light Of North Bengal")  হিসেবে পরিচিত এই কলেজটি শুধু বগুড়া নয়, বরং সমগ্র উত্তরবঙ্গের  অন্যতম বৃহৎ ও নির্ভরযোগ্য শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে সুপরিচিত।

ইতিহাস

                        ইতিহাস

কলেজের যাত্রার শুরুতে কেবলমাত্র আই-এ শ্রেণী চালুর অনুমতি পায়। শুরুতে প্রায় ২০০ জন শিক্ষার্থী ছিল কোন ছাত্রী ছিল না। প্রথম ব্যাচের ছাত্রদের মধ্যে যাদের নাম পাওয়া তারা হলেন মোজাম পাইকার, আমীর আলী, শফিকুর রহমান, আব্দুল মালেক নূরুল ইসলাম ভোলা প্রমুখ।১৯৪১ সালে কলেজের প্রথম ব্যাচের পরীক্ষার ফলাফলে দেখা যায় ১৫২ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১০৭ জন পরীক্ষায় পাশ করে। এর মধ্যে প্রথম বিভাগে ০৮ জন, দ্বিতীয় বিভাগে ৬৪ জন এবং তৃতীয় বিভাগে ৩৫ জন পাশ করে। পাশের হার ছিল ৬৯.২%। অথচ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই হার ছিল ৬৩.৪%।

১৯৩৮ সালের ৪ এপ্রিল বগুড়ায় একটি আধুনিক ও মানসম্মত কলেজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে খাঁন বাহাদুর মোহাম্মদ আলীকে সভাপতি এবং মৌলভী আব্দুস সাত্তারকে সাধারণ সম্পাদক করে একটি শক্তিশালী উদ্যোগী কমিটি গঠিত হয়, যেখানে সে সময়ের বিশিষ্ট ব্যাক্তিরা ডা. হাবিবুর রহমান, পূর্ণচন্দ্র রায়, প্রজাবন্ধু রাজীব উদ্দীন তরফদারসহ তৎকালীন সমাজের বিশিষ্ট আরও অনেকে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। এই কমিটির নিরলস প্রচেষ্টার ফলেই ১৯৩৯ সালের ৯ জুলাই কলেজটি আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। প্রথমদিকে প্রাথমিকভাবে ‘বগুড়া কলেজ’ নামে পরিচিত হলেও এই প্রতিষ্ঠানটি পরবর্তীতে অবিভক্ত বাংলার প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ও তৎকালীন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়-এর উপাচার্য স্যার আজিজুল হকের নামানুসারে নামকরণ করা হয়, যা এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব, ঐতিহ্য ও মর্যাদাকে আরও উজ্জ্বল করে তোলে।

প্রতিষ্ঠার শুরুর দিকে কলেজটির পাঠদান কার্যক্রম বগুড়া শহরের উত্তর পাশে সুবিল ফ্রি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অস্থায়ীভাবে পরিচালিত হয় এবং পরবর্তীতে ফুলবাড়ী বটতলায় স্থানান্তরিত করা হয়।অতি সাধারণ অবকাঠামো, এমনকি অল্প পরিসরে খড়-ছাওয়া ঘর দিয়ে যাত্রা শুরু হলেও স্থানীয় দানশীল ব্যক্তিদের অবদানে প্রতিষ্ঠানটি দ্রুত বিকাশ লাভ করে।বিশেষ করে ফুলবাড়ীর ময়েন উদ্দিন প্রামাণিক ও রসিদুল্লাহ সরদারের  জমি দান কলেজের স্থায়ী ভিত্তি গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ১৯৪১ সালে স্যার আজিজুল হকের উদ্যোগে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কলেজটিকে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন প্রদান করে, যা এর একাডেমিক কার্যক্রমকে আরও সুসংহত করে। 

কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক পর্যায়ে আই.এ. শ্রেণীতে বাংলা (সাধারণ), বাংলা (দ্বিতীয় ভাষা), ইংরেজি (আবশ্যিক ও অতিরিক্ত), ইতিহাস, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, যুক্তিবিদ্যা, পৌরনীতি, সাধারণ গণিত এবং আরবি/ফার্সি বিষয় পড়ানোর অনুমোদন প্রদান করা হয়।

প্রতিষ্ঠাকালে কলেজের শিক্ষকমণ্ডলীতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন— ইংরেজি বিষয়ে শ্রী কে. সি. চক্রবর্তী, বাংলা ও সংস্কৃত বিষয়ে শ্রী প্রভাত চন্দ্র সেন (এম.এ, বি.টি), আরবি ও ফার্সি বিষয়ে মোঃ আব্দুল গফুর, গণিতে শ্রী মনিন্দ্র চন্দ্র চাকী (এম.এ), ইতিহাসে শ্রী এস.পি. সেন (বি.এ সম্মান, লন্ডন), যুক্তিবিদ্যায় মোঃ ফজলুর রহমান (এম.এ) এবং পৌরনীতিতে মোঃ আকবর কবির (এম.এ)।

প্রতিষ্ঠার শুরুতে কলেজে কোনো ছাত্রী না থাকলেও ছাত্রী ভর্তিতে কোনো ধরনের নিষেধাজ্ঞা ছিল না। ১৯৪৩ সাল থেকে কলেজে ছাত্রী ভর্তি কার্যক্রম শুরু হয়, যেখানে প্রথমদিকে ৮ থেকে ১২ জন ছাত্রী ভর্তি হন। পরবর্তীতে এই সংখ্যা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়। ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত ছাত্রীরা সকালে ভি.এম. গার্লস স্কুলে ক্লাস করত। একই বছর কলেজে সহশিক্ষা চালু হলে এই সীমাবদ্ধতা দূর হয় এবং শিক্ষা কার্যক্রমে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়।এরপর ১৯৪৫-৪৬ শিক্ষাবর্ষ হতে কলেজটি বংলা এবং আরবী বিভাগে সম্মান ও আই.কম শ্রেণী চালুর অনুমতি লাভ করে। 


কলেজটির প্রথম অধ্যক্ষ ছিলেন ড. এম.এম. মুখার্জি এবং প্রথম উপাধ্যক্ষ ছিলেন শ্রী এস.পি. সেন। ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাগের পূর্বে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ২১৬টি কলেজের মধ্যে এটি অন্যতম ছিল এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থিত শীর্ষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর একটি হিসেবে দ্রুত খ্যাতি অর্জন করে। প্রশাসনিক জটিলতার অজুহাতে সেসময় কলেজে সম্মান শ্রেণী পরিত্যাক্ত হয়, এবং আই.এস.সি. শ্রেণী (পদার্থ, রসায়ন, অঙ্ক) চালুর অনুমতি পায়। আই.এস.সি. শ্রেণীতে বায়োলজি বিষয় অমত্মর্ভূক্ত হয় ১৯৪৮-৪৯ শিক্ষাবর্ষে। এর কিছুকাল পরে ১৯৫৪-৫৫ শিক্ষাবর্ষে কলেজটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ হয় এবং আরবী, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগে তিন বছর মেয়াদী সম্মান শ্রেণী চালু করা হয়। সরকাররিকরনের পর কলেজে বাংলা, অর্থনীতি, ইতিহাস, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ে সম্মান পড়ানোর পাশাপাশি বি.এ,বি.কম, বি.এস.সি, আই.এ, আই.কম, আই.এস.সি চালু হয়।সময়ের সাথে সাথে এটি উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রধান বিদ্যাপীঠে পরিণত হয়।পরবর্তীতে ১৯৬২ সালে ডা. হাবিবুর রহমানের উদ্যোগে প্রায় ৫৫ একর জমির ওপর কলেজটির নতুন ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠিত হয়, যা বর্তমানের প্রধান অবকাঠামো হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ১৯৬৮ সালের ১৫ এপ্রিল কলেজটি সরকারিকরণ করা হলে এর প্রশাসনিক ও একাডেমিক কাঠামো আরও শক্তিশালী হয়। বর্তমানে সরকারি আজিজুল হক কলেজ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়-এর অধিভুক্ত একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান, যেখানে উচ্চ মাধ্যমিক, স্নাতক (সম্মান) এবং স্নাতকোত্তর পর্যায়ে বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা প্রদান করা হয়।

১৯৭২-৭৩ সালে সম্মান কোর্সে বাংলা, ইহিতাস, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, অর্থনীতি, আরবি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, রসায়ন, পদার্থবিদ্যা, গণিত ও হিসাববিজ্ঞান চালু হয়। মাস্টার্স কোর্স অর্থনীতি, রাষ্ঠ্রবিজ্ঞান, ব্যবস্থাপনা, হিসাববিজ্ঞান চালু করা হয়। ১৯৭৩-৭৪ সালে মাস্টার্স ও সম্মানে যথাক্রমে ৩১৭ ও ৬১৮ সহ মোট ৩,৭৮৭ জন ছাত্রছাত্রী ছিল। শিক্ষক ছিলেন ৯০ জন।

 বর্তমানে কলেজটিতে বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা শাখায় বিস্তৃত পাঠক্রম চালু রয়েছে এবং প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী এখানে ভর্তি হয়ে তাদের শিক্ষাজীবন গড়ে তোলে। সুবিশাল ক্যাম্পাস, একাধিক একাডেমিক ভবন, গ্রন্থাগার, আবাসিক হল এবং সহশিক্ষা কার্যক্রমের সমন্বয়ে এটি উত্তরবঙ্গের অন্যতম বৃহৎ শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।।বর্তমানে সরকারি আজিজুল হক কলেজ উত্তরবঙ্গের শিক্ষার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত, যা দীর্ঘ ইতিহাস, সমৃদ্ধ ঐতিহ্য এবং মানসম্মত শিক্ষার জন্য আজও শিক্ষার্থীদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়।

ঐতিহ্য ও শিক্ষার অগ্রযাত্রা

সরকারি আজিজুল হক কলেজ

কলেজের যাত্রার শুরুতেই একাডেমিক কার্যক্রম সীমিত পরিসরে শুরু হলেও খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তা বিস্তৃত ও শক্তিশালী রূপ লাভ করে। প্রতিষ্ঠাকালে সরকারি আজিজুল হক কলেজ-এ শুধুমাত্র আই-এ (উচ্চ মাধ্যমিক) শ্রেণি চালুর অনুমতি ছিল এবং প্রায় ২০০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে কার্যক্রম শুরু হয়, যেখানে শুরুতে কোনো ছাত্রী ছিল না। প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থীদের মধ্যে মোজাম পাইকার, আমীর আলী, শফিকুর রহমান, আব্দুল মালেক ও নূরুল ইসলাম ভোলার নাম উল্লেখযোগ্য। ১৯৪১ সালে প্রথম ব্যাচের পরীক্ষায় ১৫২ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১০৭ জন উত্তীর্ণ হয়, যা প্রায় ৬৯.২% পাশের হার নির্দেশ করে—সেই সময়ের জন্য এটি একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য।

প্রতিষ্ঠার শুরুতে কলেজে বাংলা, ইংরেজি, ইতিহাস, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, যুক্তিবিদ্যা, পৌরনীতি, গণিত, আরবি ও ফার্সি সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পড়ানো হতো। দক্ষ ও অভিজ্ঞ শিক্ষকবৃন্দ যেমন কে.সি. চক্রবর্তী, প্রভাত চন্দ্র সেন, আব্দুল গফুর, মনিন্দ্র চন্দ্র চাকী এবং এস.পি. সেনের মতো শিক্ষকদের নেতৃত্বে কলেজের শিক্ষার মান দ্রুত উন্নত হতে থাকে। যদিও শুরুতে ছাত্রী ছিল না, তবে ১৯৪৩ সাল থেকে ছাত্রী ভর্তি শুরু হয় এবং ধীরে ধীরে নারী শিক্ষার পথও উন্মুক্ত হয়, যা প্রতিষ্ঠানটির প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গির পরিচায়ক

প্রতিষ্ঠার মাত্র দুই বছরের মাথায়, অর্থাৎ ১৯৪১ সালেই কলেজটি উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করে। অর্থনীতি ও ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ে অনার্স ও বি.এ পাস কোর্স চালুর অনুমতি লাভ করে, যা সে সময় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়-এর অধীনে একটি ব্যতিক্রমধর্মী অর্জন হিসেবে বিবেচিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৪৫-৪৬ শিক্ষাবর্ষে বাংলা ও আরবি বিভাগে অনার্স এবং আই.কম কোর্স চালু হয়। ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাগের পর কলেজটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর অধিভুক্ত হয় এবং পরে ১৯৫৪-৫৫ শিক্ষাবর্ষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়-এর অধীনে অন্তর্ভুক্ত হয়, যা এর একাডেমিক পরিসরকে আরও বিস্তৃত করে।

১৯৪৮-৪৯ শিক্ষাবর্ষে আই.এস.সি. শ্রেণিতে জীববিজ্ঞান অন্তর্ভুক্ত হওয়ার মাধ্যমে বিজ্ঞান শিক্ষার বিকাশ ঘটে। ১৯৬৮ সালে সরকারিকরণের পর কলেজটিতে বাংলা, অর্থনীতি, ইতিহাস, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি সহ বিভিন্ন বিষয়ে অনার্স চালুর পাশাপাশি বি.এ, বি.কম, বি.এস.সি এবং উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের বিভিন্ন কোর্স চালু হয়। ১৯৭২-৭৩ শিক্ষাবর্ষে অনার্স পর্যায়ে বিজ্ঞান, মানবিক ও বাণিজ্য বিভাগের আরও বহু বিষয় সংযোজন করা হয় এবং মাস্টার্স পর্যায়ে অর্থনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ব্যবস্থাপনা ও হিসাববিজ্ঞান চালু হয়।  সেই সময়ে সম্মান কোর্সে বাংলা, ইতিহাস, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, অর্থনীতি, আরবি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, রসায়ন, পদার্থবিদ্যা, গণিত ও হিসাববিজ্ঞান চালু হয়। মাস্টার্স কোর্সে অর্থনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ব্যবস্থাপনা, হিসাববিজ্ঞান চালু করা হয়। ১৯৭৩-৭৪ সালে মাস্টার্স ও সম্মানে যথাক্রমে ৩১৭ ও ৬১৮ সহ মোট ৩,৭৮৭ জন ছাত্র-ছাত্রী ছিল। শিক্ষক ছিলেন ৯০ জনসেই সময় কলেজে শিক্ষার্থীর সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে হাজারের ঘর ছাড়িয়ে যায় এবং প্রায় শতাধিক শিক্ষক একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনা করেন।

সরকারি আজিজুল হক কলেজ, নতুন ভবন
নতুন একাডেমিক ভবন

বর্তমানে কলেজটি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়-এর অধিভুক্ত একটি অন্যতম বৃহৎ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। এখানে অনার্স ও মাস্টার্স পর্যায়ে বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা শাখার বিভিন্ন বিষয়ে পাঠদান করা হয়। বিশেষ করে মার্কেটিং ও ফিনান্স বিষয়ে মাস্টার্স কোর্স চালু হওয়ায় এটি উত্তরবঙ্গে একটি বিশেষ অবস্থান তৈরি করেছে। নিয়মিত ও অনিয়মিত উভয় ব্যবস্থায় বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী এসব কোর্সে অধ্যয়নের সুযোগ পাচ্ছে, যেখানে ভর্তি মূলত অনার্স পর্যায়ের ফলাফলের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়।

বর্তমানে মার্কেটিং ও ফিনান্স নতুন করে মাস্টার্স কোর্স চালু করা হয়েছে। উত্তর বঙ্গে রাজশাহী কলেজের পর একমাত্র সরকারি কলেজ হিসেবে এই কোর্সে গুলোতে মাস্টার্স কোর্স চালু আছে। মার্কেটিং এ নিয়মিত মাস্টার্স সিট সংখ্যা ১০০ জন এবং অনিয়মিত বা প্রাইভেট মাস্টার্স সিট সংখ্যা ৪০০ জন। অনার্স সিজিপিএ এর উপর ভিত্তি করে ভর্তি করা হয়ে থাকে।

সব মিলিয়ে, একসময়ের ছোট পরিসরের আই-এ কলেজ থেকে শুরু করে আজকের বহুমুখী উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর—এই দীর্ঘ যাত্রায় সরকারি আজিজুল হক কলেজ উত্তরবঙ্গের শিক্ষা বিস্তারে অনন্য ভূমিকা পালন করেছে। ঐতিহ্য, একাডেমিক উন্নয়ন, বিষয়বৈচিত্র্য এবং শিক্ষার মান—সব দিক থেকেই এটি আজ দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও জনপ্রিয় শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত। 

বিভাগসমহু 

বিজ্ঞান অনুষদ:

  • পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ
  • রসায়ন বিভাগ
  • গণিত বিভাগ
  • উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ
  • প্রাণিবিদ্যা বিভাগ
  • পরিসংখ্যান বিভাগ
  • মনোবিজ্ঞান বিভাগ
  • ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ

কলা অনুষদ

  • বাংলা বিভাগ
  • ইংরেজি বিভাগ
  • ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ 
  • আরবি বিভাগ
  • ইতিহাস বিভাগ
  • ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ
  • দর্শন বিভাগ

সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ

  • অর্থনীতি বিভাগ
  • রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
  • সমাজবিজ্ঞান বিভাগ
  • সমাজকর্ম বিভাগ

ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ
  • হিসাববিজ্ঞান বিভাগ
  • ব্যবস্থাপনা বিভাগ
  • ফিন্যান্স ও ব্যাংকিং বিভাগ
  • মার্কেটিং বিভাগ

ভবন 

কলেজের পুরাতন ক্যাম্পাসে ৯টি শ্রেণী কক্ষ, ৪টি গবেষণাগার, ১টি গ্রন্থাগার, অফিস, ছাত্র-ছাত্রী বিশ্রামাগার ও একটি দ্বিতল মসজিদ রয়েছে। নতুন ক্যাম্পাসে রয়েছে ১টি ত্রিতল বিশিষ্ট কলা ভবন, ১টি ৪তলা বিজ্ঞান ভবন, ১টি ৫তলা কমার্স ভবন। এছাড়াও ১টি দ্বিতল অধ্যক্ষ ভবন, ১টি ছাত্র সংসদ ভবন, ১টি দ্বিতল মসজিদ, ১টি রোভার্স স্কাউট ভবন, ১টি শহীদ মিনার এবং ১টি খেলার মাঠ রয়েছে। নতুন ক্যাম্পাসের মোট শ্রেণীকক্ষ ৭১টি, লাইবেরীকক্ষ ৭টি ও গবেষণাগার ১৮টি

বগুড়ার সরকারি আজিজুল হক কলেজে বর্তমানে একটি নতুন ১০ তলা বিশিষ্ট একাডেমিক ভবন (সৈয়দ মুজতবা আলী ভবন) এবং ৫ তলা বিশিষ্ট ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ ভবন (ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ভবন) রয়েছে । এছাড়া পুরনো ক্যাম্পাসে ৩ তলা কলা ভবন, ৪ তলা বিজ্ঞান ভবন ও ২ তলা গ্রন্থাগার ভবন অবস্থিত। 

আজিজুল হক কলেজের প্রধান ভবনসমূহ:

নতুন ১০ তলা ভবন (সৈয়দ মুজতবা আলী ভবন): এটি কলেজের আধুনিক একাডেমিক ভবন, যা
বর্তমানে কার্যক্রমের জন্য প্রস্তুত ।
সৈয়দ মুজতবা আলী ভবন

সৈয়দ মুজতবা আলী ভবন
সৈয়দ মুজতবা আলী ভবন


ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ ভবন (ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ভবন): ৫ তলা বিশিষ্ট এই ভবনটি মূলত বাণিজ্য বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য ।
ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ ভবন (ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ভবন)
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ভবন

পুরানো ভবনসমূহ (পুরাতন ক্যাম্পাস): ৩ তলা কলা ভবন, ৪ তলা বিজ্ঞান ভবন, এবং ২ তলা গ্রন্থাগার ভবন ।
পুরানো ভবন ( পুরাতন ক্যাম্পাস)
পুরাতন ক্যাম্পাস

আবাসিক হল: বেগম রোকেয়া হল (নারী) এবং শহীদ টিটু হল, শের-ই-বাংলা হল, আক্তার আলী মুন হল (পুরুষ) । তবে পুরুষদের হলগুলো দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ ছিল । 

বেগম রোকেয়া হল
বেগম রোকেয়া হল  


ক্যাম্পাসে প্রায় ২৪ হাজার শিক্ষার্থী এবং ৭১টি শ্রেণিকক্ষ ও ১৮টি গবেষণাগার রয়েছে। 

ছাত্রাবাস  

সরকারি আজিজুল হক কলেজের নতুন ক্যাম্পাসে ছাত্রদের জন্য তিতুমীর হল, শের-ই-বাংলা হল ও শহীদ আকতার আলী মুন হল নামে ৩টি  হল রয়েছে। তবে শুধুমাত্র বেগম রোকেয়া হল ব্যতীত ছাত্রদের ৩টি আবাসিক হল ২০০৯ সাল থেকে সম্পূর্ণ বন্ধ। মূলত ২০০৯ সালের ২০ ডিসেম্বর হল দখলকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগ ও ছাত্রশিবিরের মাঝে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়, যার পরিপ্রেক্ষিতে কলেজ কর্তৃপক্ষ ৩টি হলই বন্ধ ঘোষণা করে। এর মাঝে শের-ই-বাংলা হল ইতোমধ্যে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। যা ছাত্রদের জন্য চরম ভোগান্তি কারন হয়ে দাঁড়িয়েছে।পুরাতন ক্যাম্পাসে ছাত্রদের জন্য ফখরুদ্দিন আহমদ হল নামে একটি হল রয়েছে, যেখানে শুধু উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণির ছাত্ররা থাকতে পারে। বিভিন্ন সময়ে হল খোলার আশ্বাস দেওয়া হলেও, নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক কারণে ছেলেদের হলগুলো দীর্ঘ ১৪-১৬ বছর ধরে তালাবদ্ধ রয়েছে। 


ফখরুদ্দিন আহমদ হল, উচ্চমাধ্যমিক ভবন 


ছাত্রি নিবাস 

বগুড়ার সরকারি আজিজুল হক কলেজে বর্তমানে মূলত ছাত্রীদের জন্য বেগম রোকেয়া হল (নতুন ও পুরাতন ভবনসহ) সচল রয়েছে। এছাড়া ২০১৮ সালে ছাত্রীদের জন্য আরেকটি নতুন আবাসিক হল নির্মাণ করা হয়েছে। 
প্রায় ২৫-৩০ হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে আবাসিক আসন অত্যন্ত সীমিত, যার বেশিরভাগই বন্ধ। 

গ্রন্থাগার 


GOVT. Azizul Haque College

আজিজুল হক কলেজ

গ্রন্থাগার

বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজের গ্রন্থাগারটি উত্তরবঙ্গের অন্যতম সমৃদ্ধ ও ঐতিহ্যবাহী কলেজ লাইব্রেরি। ১৯৩৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কলেজের লাইব্রেরিটি প্রায় ৩২,০০০ শিক্ষার্থী এবং ১৯৬ জন শিক্ষকের পাঠ চাহিদা মেটাতে একাডেমিক, গবেষণামূলক এবং বিভিন্ন রেফারেন্স বইয়ের প্রায় ২২০০০ এর  একটি বিশাল সংগ্রহ নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে । 
গ্রন্থাগারের মূল তথ্যসমূহ:
অবস্থান: বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজের প্রধান ক্যাম্পাস ।
সমৃদ্ধি: এখানে প্রচুর সংখ্যক দুর্লভ বই, একাডেমিক বই, জার্নাল এবং গবেষণাপত্র প্রায় ২২০০০ পুস্তক  রয়েছে।
পাঠকক্ষ: শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার জন্য লাইব্রেরি ভবনে বিশেষ রিডিং রুম বা পাঠকক্ষ বা পাঠাগার রয়েছে ।
পরিষেবা: কলেজটির অফিসিয়াল ওয়েবসাইট  অনুযায়ী, এখানে একাডেমিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে লাইব্রেরি সুবিধাসমূহ প্রদান করা হয়। 

এই বিশাল গ্রন্থাগারে পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সাহিত্যের বিপুল সংগ্রহ সংরক্ষিত রয়েছে।

সংগঠন 

রাজনৈতিকঃ 

বাংলাদেশ ছাত্রলীগ - Bangladesh Student's League
• বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল - Bangladesh Nationalist Student's Party
• সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ - Student's Rights Protection Council
• বামপন্থী ছাত্র সংগঠনসমূহ: - Leftist Student Organizations
• বাংলাদেশ ইসলামি ছাত্রশিবির - Bangladesh Islamic Student's Organization
• সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট - Socialist Student's Front
• বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন - Bagladesh Student's Union 

স্বেচ্ছাসেবকঃ 
• রোভার স্কাউট গ্রুপ- Rover Scout Group
• বিএনসিসি- BNCC( Bangladesh Nationa Cadet Corps) 
• রেড ক্রিসেন্ট- Red Crescent 
• রক্তদান ও সামাজিক সংগঠন-Blood Donation & Social Organization 

সাংস্কৃতিকঃ 
বগুড়ার সরকারি আজিজুল হক কলেজে বেশ কিছু সক্রিয় সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠন রয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক চর্চা ও মেধা বিকাশে কাজ করে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: 

• সাংস্কৃতিক পরিষদ: সরকারি আজিজুল হক কলেজ সাংস্কৃতিক পরিষদ এর অন্যতম প্রধান সংগঠন।

• কলেজ থিয়েটার: নাটক ও অভিনয়ের চর্চাকেন্দ্র ।

• নীলতলী: একটি সক্রিয় সাংস্কৃতিক সংগঠন ।

• বিএনসিসি (BNCC): সামরিক প্রশিক্ষণ ও শৃঙ্খলা চর্চার জন্য ।

• রোভার স্কাউট: সামাজিক ও সেবামূলক কার্যক্রমের জন্য ।

• রেড ক্রিসেন্ট: স্বেচ্ছাসেবী ও সামাজিক সংগঠন । 

এছাড়া বিভিন্ন জাতীয় দিবস ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে এই সংগঠনগুলো কলেজের সাংস্কৃতিক পরিবেশ সচল রাখে। 

বিতর্ক ক্লাবঃ 

বগুড়ার সরকারি আজিজুল হক কলেজে সক্রিয় বিতর্ক ক্লাবগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো সরকারি আজিজুল হক কলেজ ডিবেটিং ক্লাব । এই ক্লাবটি কলেজ পর্যায়ে বিভিন্ন আন্তঃবিভাগীয় ও জাতীয় বিতর্ক প্রতিযোগিতার আয়োজন এবং অংশগ্রহণ করে থাকে। এছাড়া, কলেজের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংসদের অধীনেও নিয়মিত বিতর্ক চর্চা ও প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয় । 

শিক্ষার্থী সংগঠনঃ 

  • ফিন্যান্স ও ব্যাংকিং ক্যারিয়ার ক্লাব (এফবিসিসি )

“পরিশেষে বলা যায়, আজিজুল হক কলেজ তার ঐতিহ্য, মানসম্মত শিক্ষা ও সহশিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সার্বিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে এবং ভবিষ্যতেও এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে বলে প্রত্যাশা করা যায়।”

আরও পড়ুনঃ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন